বেঞ্চ সহকারী এর কাজ কি? দায়িত্ব, কর্তব্য, যোগ্যতা, বেতন ও ক্যারিয়ার গাইড

আদালতের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিচারকের এজলাসের পাশে ব্যস্ত এক ব্যক্তি। হাতে ফাইল, দৃষ্টিতে গভীর মনোযোগ। ইনিই হলেন বেঞ্চ সহকারী। আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমের মেরুদণ্ড বলা চলে এই পদের কর্মীদের। কিন্তু বেঞ্চ সহকারী যে শুধু ফাইলপত্র আগলান, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। একজন বিচারকের শুনানি নির্বিঘ্ন করতে পর্দার পেছনে যে বিপুল কর্মযজ্ঞ চলে, তার কেন্দ্রে আছেন এই বেঞ্চ সহকারী। ২০২৬ সালে এসে বেঞ্চ সহকারী পদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ বিচার বিভাগীয় কাজে গতি আনতে দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন জনবলের চাহিদা এখন তুঙ্গে। আপনি যদি এই চাকরি সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে চান, তাহলে এই বিস্তারিত গাইড আপনার জন্য।

বেঞ্চ সহকারী কে?

বেঞ্চ সহকারী বা পেশকার হলেন আদালতের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী, যিনি এজলাসে বিচারককে আইনি ও দাপ্তরিক কাজে সরাসরি সাহায্য করেন। তাঁর মূল দায়িত্ব হলো মামলার নথিপত্র সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা, শুনানির তালিকা (কজ লিস্ট) তৈরি করা, বিচার চলাকালীন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিচারকের সামনে উপস্থাপন করা এবং আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

বেঞ্চ সহকারী বলতে কী বোঝায়?

সত্যি বলতে, বেঞ্চ সহকারী হলেন বিচারকের সরাসরি সহযোগী কর্মচারী। বাংলায় “বেঞ্চ” বলতে আমরা বুঝি আদালতের সেই জায়গা যেখানে বিচারক বসেন, আর “সহকারী” শব্দটাই তার কাজের ধরন স্পষ্ট করে দেয়। ইনি মূলত প্রশাসনিক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, যিনি বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, বিচারকের রায় লেখার পেছনে সহায়তাকারী হিসেবেও তার ভূমিকা আছে, বিশেষ করে তথ্য ও নথির সমন্বয় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে।

বেঞ্চ সহকারী কোথায় কাজ করেন?

বেঞ্চ সহকারীর কাজের পরিধি আসলে সুবিশাল। জেলা জজ আদালত, দায়রা জজ আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বিশেষ জজ আদালত সব জায়গায় এই পদটি বিদ্যমান। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগেও বেঞ্চ সহকারী আছেন, তবে সেখানে পদটির নাম বা গ্রেড ভিন্ন হতে পারে। মূল কথা, যেখানে আদালত বসে, সেখানেই বেঞ্চ সহকারীর উপস্থিতি অপরিহার্য। কাজের চাপ ও মান সম্মান বিচার করলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ।

বেঞ্চ সহকারীর মূল দায়িত্ব কী?

কথায় বলে, “বেঞ্চ সহকারী রাগলে বিচারকও বিপদে পড়েন” ব্যাপারটা একটু বাড়িয়ে বলা হলেও পুরো মিথ্যে নয়। কারণ বিচারকের দৈনন্দিন কাজের সিংহভাগই নির্ভর করে বেঞ্চ সহকারীর ওপর। তার মূল দায়িত্ব হলো আদালতের রেকর্ড, ফাইলপত্র, মামলার তালিকা দেখা এবং বিচারকের ডিক্টেশন নোট বা নির্দেশনা লিখে রাখা। পাশাপাশি, বিচারকের সামনে হাজিরা (উপস্থিতি) ব্যবস্থাপনা, সাক্ষ্য গ্রহণে সহায়তা করাও তার কাজ।

বেঞ্চ সহকারীর কাজ কী?

আসলে বেঞ্চ সহকারীর কাজ কী এই প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে দেওয়া কঠিন। কারণ দায়িত্বের তালিকা অনেক লম্বা। সহজ বাংলায় বললে, বিচারক ছাড়া আদালতের যাবতীয় অফিসিয়াল কাজে যিনি বিচারকের হয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, তাকেই বেঞ্চ সহকারী বলা হয়। আসুন বিস্তারিত জেনে নিই।

আদালতের কার্যক্রমে সহায়তা করা

প্রতিদিন সকাল বেলায় বেঞ্চ সহকারীকেই প্রথম এজলাসে ঢুকতে দেখা যায়। মামলার তালিকা (কজলিস্ট) বিচারকের টেবিলে গুছিয়ে রাখা, কোন মামলায় কতজন সাক্ষী আসবেন, আগামী তারিখ কী ধার্য আছে সবকিছুর একটা চেকলিস্ট তার হাতে থাকে। এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না যে, বিচারক এজলাসে বসার আগেই শুনানির জন্য একটি খসড়া প্রস্তুতি বেঞ্চ সহকারী সেরে রাখেন। তিনি জানেন কোন ফাইল আগে দিতে হবে, কোনটা জরুরি ভিত্তিতে উপস্থাপন করা দরকার।

বিচারকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা

বিচারক যখন মৌখিক নির্দেশ দেন, “এই মামলায় আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন চাও”, তখনই বেঞ্চ সহকারী তা নোট করে প্রয়োজনীয় চিঠি বা আদেশপত্র (রোবকারি) তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আবার বিচারক কোন জামিন আবেদনের শর্ত দেওয়ার সময় ডিক্টেশন দিলে, বেঞ্চ সহকারী সেই ডিক্টেশনকে কম্পিউটারে টাইপ করে জমা রাখেন। আদালতের কাজে গতি আনার মূলে এই সমন্বয়টাই আসল চাবিকাঠি।

মামলার নথি ও ফাইল সংরক্ষণ করা

আদালতের ভল্ট বা রেকর্ড রুম বুঝলে একটা গোলকধাঁধার মতো। লাখ লাখ মামলার নথি, সার্টিফাইড কপি, পুরনো রেকর্ড এগুলো ব্যবস্থাপনা করতে হয় বেঞ্চ সহকারীর তত্ত্বাবধানে। একটি ফাইল হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে বিপদ অনেক বড়। তাই ইস্যু রেজিস্টার খাতায় প্রতিটি নথির রশিদ এন্ট্রি করা এবং দায়িত্বশীল কর্মচারীকে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটি তিনি করেন। এখন অধিকাংশ আদালতে ‘কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS)’ চালু হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণে তারাই মুখ্য ভূমিকা রাখছেন।

মামলার নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা

শুনানির মাঝপথে আইনজীবী বললেন, “মহোদয়, মামলার এজাহার বা চার্জশিটের একটি কপি প্রয়োজন।” বিচারক ইশারা করলেই বেঞ্চ সহকারী সেটা এগিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, সাক্ষ্য গ্রহণের সময় প্রসিকিউশন বা ডিফেন্স ল’ইয়ার কাগজপত্র দাখিল করলে, বেঞ্চ সহকারী সেগুলো গ্রহণ করে চিহ্নিত করেন এবং বিচারককে দেখান। দলিলের তালিকা বানানো, আলামত জমা রাখা এসবও তার আওতায় পড়ে।

আদালতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করা

এজলাসের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে বেঞ্চ সহকারীর ভূমিকা আছে বৈকি। বিচারকের সামনে কে দাঁড়াবেন, কখন দাঁড়াবেন, জনতা যাতে শোরগোল না করে, সাক্ষী যাতে নির্বিঘ্নে সাক্ষ্য দিতে পারেন এসব দেখভাল করা তার কর্তব্য। এজলাসে বিচারক প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় “রাইজ” বা “কোর্ট” বলার প্রথাও অনেকক্ষেত্রে বেঞ্চ সহকারীই পালন করেন। আবার কখনো কখনো পেশকার এর কাজ কি তা বোঝার মতো কিছু দায়িত্বও তাকে পালন করতে হয়, যদিও দুজনের কাজের পরিধি ভিন্ন।

বেঞ্চ সহকারীর দৈনন্দিন দায়িত্ব ও কর্তব্য

বেঞ্চ সহকারীর এক একটা দিন যেন এক একটা যুদ্ধের সমান। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা এই সময়টা শুধু টেবিলে বসে কাগজপত্র দেখা নয়; বরং পুরো এজলাসের ইঞ্জিনরুম চালানো। নিচে এক নজরে দায়িত্বগুলো দেওয়া হলো।

বিচারকের বেঞ্চ প্রস্তুত রাখা

এজলাসে ঢোকার পর প্রথম কাজ বিচারকের টেবিল বা বেঞ্চ পুরোপুরি কর্মোপযোগী করা। কম্পিউটার, প্রিন্টার, মাইক্রোফোন ঠিক আছে কিনা যাচাই করা। প্রয়োজনীয় স্টেশনারি, আইনের বই, গেজেট নোটিফিকেশন হাতের কাছে রাখা। আদালতভেদে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা বা ফ্যান চালু আছে কিনা সেটাও দেখতে হয়।

মামলার তালিকা ও রেকর্ড পরিচালনা

এটা বেঞ্চ সহকারীর একক কোর দায়িত্ব। কজলিস্ট বা কারণ তালিকা অনুযায়ী ফাইল সাজানো, কোন মামলা উঠবে, কোনটি পিছিয়েছে, কোন বিচারপ্রার্থী জামিনে আছেন এসবের হালনাগাদ তথ্য তার আয়ত্তে থাকে। তিনি চাইলেই একটি মামলাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে দিতে পারেন বিচারকের অনুমতিক্রমে।

শুনানির সময় প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ

শুনানি চলাকালে আইনজীবী কোনো রেফারেন্স ধরলে বা জবানবন্দির অংশ পড়তে চাইলে, দ্রুত ফাইলের সঠিক পৃষ্ঠা খুলে দেওয়া; এটা বেশ দক্ষতার কাজ। কারণ ফাইলের ভেতর হাজারো কাগজপত্র থাকে, ভুল পৃষ্ঠা বের হলে বিচারকের মেজাজ বিগড়ানোরও নজির আছে।

আদালতের অফিসিয়াল রেকর্ড সংরক্ষণ

বিচারক আদেশ দিলে বা রায় ঘোষণা করলে, সেই রায়ের সারাংশ বা ‘অর্ডারশিট’ তাৎক্ষণিকভাবে কম্পিউটারে এন্ট্রি করে রাখতে হয়। পুরনো রেকর্ড নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা, আপিলের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের ব্যবস্থা করা; এসব দৈনন্দিন রুটিনের বাইরেও করতে হয়।

অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন

সংশ্লিষ্ট সেরেস্তাদার বা অফিস সুপারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাপ্তরিক চিঠিপত্র তৈরি, স্ট্যাম্প সংগ্রহ ও সরবরাহ, এমনকি কোনো দর্শনার্থী বা শিক্ষার্থী দল এজলাস পরিদর্শনে এলে তাদের ব্রিফ করা এই কাজগুলোও বেঞ্চ সহকারী করে থাকেন। মূল প্রশাসনিক কাজের ফাঁকে এগুলো মাস্ট।

বেঞ্চ সহকারী হতে কী যোগ্যতা লাগে?

বেঞ্চ সহকারী হতে গেলে শুধু একটা ডিগ্রি থাকলেই চলবে না, থাকতে হবে অর্ধশত গুণের সমাবেশ। নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন অথবা জেলা জজ কর্তৃপক্ষ কঠোর নিয়ম মেনে চলে। ২০২৬ সালের জন্য আপডেটেড যোগ্যতা নিচে দেওয়া হলো।

শিক্ষাগত যোগ্যতা

  • ন্যূনতম স্নাতক (অনার্স/পাস) ডিগ্রিধারী হতে হবে।
  • স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেকোনো বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) থাকলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
  • শিক্ষা জীবনে তৃতীয় বিভাগ বা সমমানের সিজিপিএ থাকলে অনেকক্ষেত্রেই আবেদনপত্র বাতিল হয়। ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণি চাওয়া হয়।

কম্পিউটার দক্ষতা

বর্তমানে অন্ধের মতো কম্পিউটার চালাতে পারলে চলবে না। MS Word, Excel, Power Point এ দখল থাকা মাস্ট। কারণ আদালতের সিএমএস সফটওয়্যার পরিচালনা থেকে শুরু করে ই-ফাইলিং সিস্টেম— সবই এখন ডিজিটাল। টাইপিং স্পিড কমপক্ষে বাংলায় ২৫ ও ইংরেজিতে ৩০ শব্দ প্রতি মিনিটে চাওয়া হয়। যারা স্টেনোগ্রাফার এর কাজ কি? জানেন, তারা বুঝবেন টাইপিংয়ের গুরুত্ব এখানে কেন এত জরুরি।

প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত দক্ষতা

  • সততা ও গোপনীয়তা রক্ষা: বিচারক যা ডিক্টেশন দেন বা মামলার সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হলে বড় বিপদ, তাই এই গুণে তার শীর্ষে থাকতে হবে।
  • পরিচ্ছন্নতা ও রুচিশীল পোশাক: আদালত একটি রক্ষণশীল পরিমণ্ডল। মার্জিত পোশাক-আশাক চাই-ই চাই।
  • চাপের মধ্যে কাজ করার মানসিকতা: একসঙ্গে ৫০টি মামলার ফাইল সামলানোর ধৈর্য সবার থাকে না।
  • শুদ্ধ ভাষাজ্ঞান: বাংলা ও ইংরেজিতে দুর্বলতা থাকলে আদেশপত্রের খসড়া করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।

বয়সসীমা

সাধারণ প্রার্থীদের জন্য ১৮ থেকে ৩০ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩২ বছর পর্যন্ত শিথিলযোগ্য। ২০২৬ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে নতুন সার্কুলার জারি হলে এই শর্ত কিছুটা নমনীয় হতে পারে।

বেঞ্চ সহকারীর বেতন কত?

বেতার কথা বললে সবার আগে জানা দরকার গ্রেড। বেঞ্চ সহকারী জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-র ১৩তম গ্রেডের পদ ছিলেন। তবে বর্তমান ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলে (যা এখন বহাল) তা উন্নীত হয়েছে। নিয়োগের ধরণ অনুযায়ী গ্রেড ভিন্ন হতে পারে, তবে কোর পদটি এখন গ্রেড-১২ বা কোন কোন ক্ষেত্রে গ্রেড-১০ এ দেখা যায়।

জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী গ্রেড

পদবীগ্রেড (২০২৫-২৬)পে-স্কেল
বেঞ্চ সহকারী (নিয়মিত)১২তম গ্রেড১০,২০০ – ২৪,৬৮০ (মোট)
বেঞ্চ সহকারী (কোর্ট স্পেশাল)১০ম গ্রেড১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ (মোট)

মূল বেতন

১২তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন ১০,২০০ টাকা (বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৪%)। পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা, এবং পেনশন সুবিধা যুক্ত হয়। ১০ম গ্রেডে মূল বেতন শুরু ১৬,০০০ টাকা। পদোন্নতি পেয়ে কেউ কেউ সহকারী রেজিস্ট্রার বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলে বেতন আরও বেড়ে যায়।

অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা

মাসিক বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি উৎসব ভাতা মূল বেতনের ২৫% হারে বছরে দুইবার। এছাড়াও অবসরোত্তর কল্যাণ ভাতা এবং গ্র্যাচুইটি তো আছেই। এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না যে, বেঞ্চ সহকারীরা ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড অফিস থেকে সম্মানী ভাতাও পেতে পারেন, যদি তারা গরিব বিচারপ্রার্থীদের সহায়তায় যুক্ত থাকেন।

বেঞ্চ সহকারীর চাকরির সুযোগ ও ক্যারিয়ার

বিচার বিভাগে যেয়ে কি আর ক্যারিয়ার হয়? এই ধারণা অনেকের। কিন্তু বাস্তবতা পুরো উল্টো। বেঞ্চ সহকারী থেকে শুরু করে একজন ব্যক্তি অবসর নেওয়ার আগে সিনিয়র অফিসার পর্যন্ত হতে পারেন।

পদোন্নতির সুযোগ

বেঞ্চ সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলে প্রথম পদোন্নতি হয় সিনিয়র বেঞ্চ সহকারী বা হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এরপর ধাপে ধাপে অফিস সুপার, সহকারী রেজিস্ট্রার, এমনকি উপ-রেজিস্ট্রার পদেও উন্নীত হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে সুপিরিয়র পদগুলোতে অভিজ্ঞ বেঞ্চ সহকারীরা আবেদন করতে পারেন।

কোন কোন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হয়?

  • জেলা ও দায়রা জজ আদালত
  • সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) – এখানে সাধারণত ‘বেঞ্চ অফিসার’ নামে অভিহিত
  • বিশেষ জজ আদালত
  • শ্রম আদালত
  • পরিবেশ আদালত
  • সাইবার ট্রাইব্যুনাল

শুধু বিচার বিভাগই নয়, আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান যেমন ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালেও এই পদের চাহিদা আছে।

ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্ভাবনা

সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও সম্মান দুটোই আছে। বেঞ্চ সহকারীর চাকরিতে বিচারকদের সান্নিধ্যে আসার সুবাদে আইনের গভীর জ্ঞান অর্জিত হয়। অনেকে পরবর্তীতে আইনজীবী বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য এটাকে লঞ্চিং প্যাড হিসেবে ব্যবহার করেন। সহকর্মীরা জানান, আদালতের পরিবেশে থেকে থেকে আইনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়, যা পরবর্তী জীবনে কাজে লাগে।

বেঞ্চ সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি

নিয়োগ পরীক্ষাটা বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বা জেলা কর্তৃপক্ষ সাধারণত তিন ধাপে পরীক্ষা নেয়।

লিখিত পরীক্ষার বিষয়

  • বাংলা (রচনা, ব্যাকরণ, অনুবাদ)
  • ইংরেজি (Precis, Composition, Translation)
  • সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক, মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান)
  • গণিত (সপ্তম-দশম শ্রেণির সাধারণ অংক, বীজগণিত, জ্যামিতি)

ভাইভা প্রস্তুতি

ভাইভা বোর্ডে সাধারণত আইন, আদালতের কাঠামো, সাম্প্রতিক আইনগত ইস্যু থেকে প্রশ্ন করা হয়। যেমন- ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা কী? দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার পার্থক্য কী? আত্মবিশ্বাস ও বিনয় ছিল ভাইভায় সফল হওয়ার মূল চাবিকাঠি বলে সিনিয়ররা বলে থাকেন।

কম্পিউটার পরীক্ষার প্রস্তুতি

এমএস ওয়ার্ড, এক্সেলে টেবিল তৈরি ও ফর্মুলা লাগানো, পাওয়ারপয়েন্টে স্লাইড এই তিনটায় জোর দিন। টাইপিং টেস্ট অ্যান্টিটাইপিং সফটওয়্যারে হয়ে থাকে, তাই বাড়িতে নির্দিষ্ট সময় ধরে প্র্যাকটিস করলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

বেঞ্চ সহকারী ও পেশকারের মধ্যে পার্থক্য

অনেকেই বেঞ্চ সহকারী ও পেশকার এর কাজ কি এক ভেবে ভুল করেন। ভিন্নতা জেনে নিলে ক্যারিয়ার পছন্দ সহজ হয়।

দায়িত্বের পার্থক্য

পেশকার মূলত পুরো সেরেস্তার (অফিস) প্রশাসনিক প্রধান। তিনি সকল বেঞ্চ সহকারী, স্টেনোগ্রাফার ও পিওনদের তদারক করেন। পক্ষান্তরে বেঞ্চ সহকারী সরাসরি একজন বিচারকের বেঞ্চে দায়িত্ব পালন করেন, তিনি ব্যক্তিগত সহকারী সুলভ। পেশকার ডিক্টেশন লেখেন না, বেঞ্চ সহকারী লেখেন।

বেতন ও গ্রেডের পার্থক্য

পেশকারের গ্রেড বেঞ্চ সহকারীর চেয়ে উচ্চতর। পেশকার সাধারণত ৯ম/১০ম গ্রেডে থাকেন, আর বেঞ্চ সহকারী ১২তম গ্রেডে (শুরুর দিকে)। অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা এখানে বড় ফ্যাক্টর।

কাজের পরিবেশের পার্থক্য

বেঞ্চ সহকারীর কাজ এজলাসকেন্দ্রিক, জনগণ ও আইনজীবীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। পেশকারের কাজ অফিসকেন্দ্রিক, ফাইল ব্যবস্থাপনা ও রিপোর্টিং নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়।

বেঞ্চ সহকারী সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

বেঞ্চ সহকারীর কাজ কী?

বেঞ্চ সহকারী বিচারকের সরাসরি সহকারী হিসেবে আদালতের এজলাসে কাজ করেন। তার কাজ হলো মামলার ফাইল ও নথিপত্র সাজানো-গোছানো, বিচারকের ডিক্টেশন নোট টাইপ করা, আদেশপত্র তৈরি করা, সাক্ষ্য গ্রহণে সহায়তা করা, এবং বিচারকের একান্ত সচিবের মতো দায়িত্ব পালন করা।

বেঞ্চ সহকারী কোন গ্রেডের চাকরি?

বাংলাদেশ জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী এটি ১৩তম গ্রেডের পদ ছিল। বর্তমানে ৮ম জাতীয় বেতন কাঠামোয় এটি ১২তম গ্রেডভুক্ত (কখনো ১০ম গ্রেড) সরকারি চাকরি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর গ্রেড নির্ভর করে।

বেঞ্চ সহকারীর বেতন কত?

১২তম গ্রেডের বেঞ্চ সহকারীর প্রাথমিক মূল বেতন ১০,২০০ টাকা এবং ১০ম গ্রেডের জন্য ১৬,০০০ টাকা। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হয়ে মোট আয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার সমতুল্য দাঁড়ায়।

বেঞ্চ সহকারী হতে কী যোগ্যতা লাগে?

ন্যূনতম স্নাতক পাস, দ্বিতীয় বিভাগ বা সমমানের সিজিপিএ থাকা চাই। কম্পিউটার চালনায় দক্ষতা ও ন্যূনতম টাইপিং স্পিড (বাংলা ২৫, ইংরেজি ৩০) থাকতে হবে। বয়স সাধারণত ১৮-৩০ বছর, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩২ বছর পর্যন্ত শিথিল।

বেঞ্চ সহকারী ও পেশকার কি একই পদ?

না, একেবারেই আলাদা পদ। পেশকার অফিসের প্রশাসনিক প্রধান, যিনি পুরো সেরেস্তা পরিচালনা করেন এবং তার গ্রেড ও বেতন বেশি। বেঞ্চ সহকারী বিচারকের ব্যক্তিগত এজলাস সহকারী, যার কাজ ফিল্ড লেভেলে সরাসরি বিচারককে সহায়তা করা।

বেঞ্চ সহকারী কোথায় কাজ করেন?

জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বিশেষ জজ আদালত, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল, শ্রম আদালত, সাইবার ট্রাইব্যুনাল এবং সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বেঞ্চ সহকারী/বেঞ্চ অফিসার কাজ করেন।

বেঞ্চ সহকারীর কাজ কি শুধুই নথিপত্র দেখা?

মোটেও না। নথিপত্র ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তাকে বিচারকের বক্তব্য নোট করা, আদেশ লিপিবদ্ধ করা, ই-ফাইলিং সিস্টেম হালনাগাদ রাখা এবং আদালতের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনকে সহায়তা করতে হয়। কেউ কেউ নিরাপত্তা প্রহরী কাজ কি? এর সাথে গুলিয়ে ফেললেও বেঞ্চ সহকারীর কাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শেষ কথা

বেঞ্চ সহকারী পেশাটি শুধু একটি চাকরি নয়, এটি বিচার বিভাগের একটি রক্তবাহী ধমনী। যদি আপনার মধ্যে দায়িত্বশীলতা, পরোপকার ও আইনের প্রতি আগ্রহ থাকে, তবে ২০২৬ সালে এই পেশা আপনার জন্য আদর্শ হতে পারে। সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ প্রত্যাশা করলে বেঞ্চ সহকারী হওয়ার চেষ্টা করতেই পারেন।

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, ৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ (সংশোধিত ২০২৪-২৫), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন, এবং আদালত কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *